মো. শাহীন আলম স্টাফ রিপোর্টার:
বঙ্গবন্ধু ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, কিন্তু জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আর্থ-সামাজিক স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক, আইকন, বাংলাদেশের মশালবাহক। তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা করে এই ভূখণ্ডের ঐতিহাসিকভাবে নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত এবং স্বাধীনচেতা বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন, সার্বভৌম জাতি রূপে এই বিশ্ব মানচিত্রে পরিচয় করিয়েছেন। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য অধিকার ভিত্তিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কারিগর জিয়াউর রহমান।
১৬ই মার্চ শুরু হয়ে ২৫ শে মার্চ গণহত্যা সংগঠিত আবার পূর্ব পর্যন্ত ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী মেজর পার্টির নেতা হিসাবে ক্ষমতার হস্তান্তর নিয়ে বঙ্গবন্ধু এবং ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত আলোচনার কোন সমঝোতা ছাডাই সমাপ্ত হয় এবং ২৫ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু পরবর্তী করণীয় নিয়ে কোন দিকনির্দেশনা না দিয়েই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করলে বাংলাদেশের মুক্তি পাগল জনগণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে উঠে।
২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তরুণ মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দিশেহারা, স্বাধীনতা পাগল জনগণ মুক্তিযুদ্ধে সর্বান্তকরণে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের একজন সম্মুখ সারির যোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগঠক জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাকামী জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিতে সক্ষম হন।
১৯৭১ সালে এ জাতির ক্রান্তিলগ্নে জিয়াউর রহমান নিজেকে তার সবটুকু দিয়ে যেমন মেলে ধরতে পেরেছিলেন, তেমনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের আর এক বিরাট ক্রান্তিলগ্নে সিপাহী জনতার বিপ্লবের কান্ডারী হিসাবে দেশ জাতির খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ করে। জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে যেমন সফল হয়েছিলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা খেতাব পেয়েছিলেন, তেমনি সাত নভেম্বরের সিপাহী জনতার বিপ্লবের পর তার উপর দেশ পরিচালনার যে গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছিল, সেখানে তিনি এমনই সফল হয়েছেন যে, আগামীর বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্র নেতাদের জন্য পথপ্রদর্শক রূপে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।
আগামীর বাংলাদেশের কোন শাসক জিয়াউর রহমানকে দেশপ্রেম, সততা, ন্যায় পরায়ণতা, জনঅধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ছাড়িয়ে যেতে পারবেনা। কেননা জিয়াউর রহমান সকল মানদন্ডে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দি শীর্ষ শিখরে নিয়ে গিয়েছেন।
জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্ণয় এবং নিশ্চিত করেছেন। আমরা কিভাবে বিশ্বের অন্যান্য জাতিসত্তা থেকে আলাদা হয়ে নতুন একটা স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করতে পারলাম, সেই পরিচয়টুকু জিয়াউর রহমান নির্ণয় করেন। এই দিক থেকে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভিত্তি। যতদিন বাংলাদেশ স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র রূপে সগৌরবে টিকে থাকবে, ততদিন জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে।
জিয়া প্রথম অনুধাবন করলে করতে পারলেন যে বাংলাদেশকে পরিপূর্ণরূপে স্বাধীন করতে হলে আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। বাংলাদেশকে যদি আর্থসামাজিক রাজনৈতিকভাবে ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বের করে না আনা যায়, তবে বাংলাদেশ কখনোই স্বাধীন সার্বভৌম স্বনির্ভর বাংলাদেশ রুপে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না।
জিয়াই প্রথম বাংলাদেশের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় পরিচয়ের সীমারেখা নির্ধারণ এবং নির্মাণ করলেন এই উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমনের গোড়া থেকে। জিয়া বুঝতে পারলেন আমরা একদিকে যেমন মুসলিম, অন্যদিকে বাঙালি। বাঙালি আমাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এবং ইসলাম আমাদের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক পরিচয়। একটা অপরটির পরিপূরক। তাই, তিনি ভারতের বাঙ্গালীদের থেকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর আলাদা পরিচয় তুলে ধরলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ দিয়ে।
জিয়া প্রথম অনুধাবন করলেন ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ হয়ে ভারত এবং পাকিস্তান তৈরি হলো। পূর্ববঙ্গের মানুষ বাঙালি হলেও কেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীদের সঙ্গে অখন্ড ভারতের অধিবাসী হতে পারল না? কেন বাংলাদেশকে বারোশো কিলোমিটার দুরের ভারত দ্বারা বিচ্ছিন্ন পাকিস্তানের অংশ হতে হলো? কেন বাংলাদেশ সীমানা বেষ্টিত ভারতের অংশ হতে পারল না? কেন একই ভাষাভাষী হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের মতো পূর্ববঙ্গ ভারতের অংশ হতে পারল না?
জিয়া বুঝলেন এর একমাত্র কারণ ধর্ম। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম হাওয়ায় মুসলিম প্রধান পাকিস্তানের অংশ হতে হয়েছে। ১৯০৫ সালে ইংরেজ সরকার বঙ্গভঙ্গ করে পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য ঢাকা কে রাজধানী করে আসাম এবং পূর্ববঙ্গ নিয়ে আলাদা প্রদেশ গঠন করেছিল, তখন পশ্চিমবঙ্গের উচ্চবর্ণের হিন্দু শিক্ষিত বাঙালি জাতীয়তাবাদের জিকির তুলে প্রচন্ড বিরোধিতা করতে থাকলে, ইংরেজ সরকার বঙ্গভঙ্গ বাতিল করতে বাধ্য হন।
বঙ্গভঙ্গ রথ হলে পূর্ববঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠী পরিপূর্ণরূপে বুঝতে সক্ষম হন যে, হিন্দু এবং মুসলমানদের স্বার্থ এক নয়। তাই, এক ভাষাভাষী হলেও ধর্ম আলাদা হবার কারণে একই রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়া সম্ভব নয়।
জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাজতান্ত্রিক বদ্ধ অর্থনীতি তিনি মুক্ত করে দেন সারা বিশ্বের বাণিজ্য, বিনিয়োগের অবাধ প্রবাহের জন্য। তিনি বঙ্গবন্ধুর সম্পদের জাতীয়করণ নীতির বিপরীতে বেসরকারি উদ্যোক্তা সৃষ্টি করে তাদের অবাধ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগের উল্লম্ফন ঘটে, ফলে দেশে সৃষ্টি হয় নতুন নতুন কর্মসংস্থান, দূর হয় দারিদ্র, সম্পদের প্রবাহ বৃদ্ধি হতে থাকলে শহর থেকে গ্রাম সকল পর্যায়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সৃষ্টি হয়।