রাজশাহীতে বিচারকের বাসায় রক্তাক্ত তাণ্ডব-জিডিতে লেখা ছিল ‘লিমন হত্যা করতে পারে’
রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আব্দুর রহমানের ছেলে তাওসিফ রহমান সুমনকে (১৬) কুপিয়ে হত্যা করেছে লিমন মিয়া (৩৫) নামে এক যুবক। এর আগে বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসী (৪৪) ওই লিমনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় সিলেটের জালালাবাদ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। কিন্তু সেই জিডির তদন্ত শুরু হয়নি।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে রাজশাহী নগরের ডাবতলা এলাকার স্পার্ক ভিউ নামের দশতলা ভবনের পাঁচতলার ফ্ল্যাটে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত সুমন রাজশাহী গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসী এবং হামলাকারী লিমন মিয়া। দুজনই বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত ৬ নভেম্বর তাসমিন নাহার লুসী সিলেটের জালালাবাদ থানায় একটি জিডি করেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সদস্য হওয়ায় লিমন মিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। পরিচয়ের পর সে আমার মোবাইল নম্বর নেয়। তার পরিবার আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ায় সে প্রায় সময় সহযোগিতা চাইত। কিন্তু একপর্যায়ে আমি অপারগতা জানালে সে ফোন করে নানারকম হুমকি-ধমকি দিতে থাকে।
জিডিতে আরও বলা হয়, গত ৩ নভেম্বর সকালে লিমন আমার মেয়ের ফেসবুক মেসেঞ্জারে কল করে আমাকে ও আমার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়। যে কোনো সময় সে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে বলে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।
জালালাবাদ থানার ওসি শাহ মোহাম্মদ মোবাশ্বির বলেন, জিডি হওয়ার পর আদালতের অনুমতি নিতে হয় তদন্ত শুরুর জন্য। আমরা জিডিটি আদালতে পাঠিয়েছি, কিন্তু এখনও অনুমতি পাইনি। তাই তদন্ত শুরু করা যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে লিমন মিয়া ‘বিচারকের ভাই’ পরিচয়ে স্পার্ক ভিউ ভবনে ঢোকেন। দারোয়ান মেসের আলী জানান, লিমন নামে ওই ব্যক্তিকে আগে কখনও দেখিনি। কিন্তু তিনি বিচারকের ভাই পরিচয় দেওয়ায় তাকে ঢুকতে দিই। খাতায় তার নাম ও মোবাইল নম্বর লিখিয়ে নিই। তার হাতে একটি ব্যাগ ছিল।
দুপুর আড়াইটার দিকে লিমন ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। প্রায় ৩০ মিনিট পর গৃহকর্মী নিচে নেমে জানায়, ফ্ল্যাটে বিচারকের ছেলে ও স্ত্রীকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। পরে ভবনের অন্য বাসিন্দারা গিয়ে তিনজনকেই রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেন।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাওসিফ রহমান সুমনের মৃত্যু হয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতচিহ্ন রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিচারকের স্ত্রীর ডান হাত, উরু এবং বাঁ বাহুতে গভীর জখম রয়েছে, এমনকি ডান হাতের একটি রগ কেটে গেছে। অস্ত্রোপচার শেষে তার অবস্থা এখন স্থিতিশীল।
অন্যদিকে, হামলাকারী লিমনের ডান হাতে আঘাত পাওয়া গেছে, তবে সেটি গুরুতর নয়।
ঘটনার পর বিকেল ৫টার দিকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, হামলাকারীর পকেট থেকে একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি একজন চালক এবং পূর্বপরিচিত ছিলেন। তাসমিন নাহার তার বিরুদ্ধে আগেই জিডি করেছিলেন। বর্তমানে হামলাকারী পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, হত্যার কারণ উদ্ঘাটনে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেই এই হামলা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিচারক আব্দুর রহমানের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার চকপাড়া গ্রামে। ঘাতক লিমন মিয়ার বাড়ি গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার মদনেরপাড়া ভবানীগঞ্জ গ্রামে। তিনি পেশায় চালক বলে জানা গেছে।
বিচারকের মেয়ে বিবাহিত হলেও তিনি বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। সিলেটে মেয়ের কাছে অবস্থানকালে তাসমিন নাহার লিমনের হুমকি পেয়ে ওই জিডিটি করেছিলেন।
জিডির পরও কোনো তদন্ত না হওয়া এবং হুমকি দেওয়ার মাত্র সাত দিনের মাথায় ঘটলো এই হত্যাকাণ্ড— এতে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজশাহীর আইন অঙ্গনের কর্মকর্তারা।