
*চোখের জলে লেখা স্বপ্নের প্রেসক্রিপশন:এতিম অনামিকার মেডিকেল জয়ের গল্প
*চোখের জলেই লেখা ছিল এতিম অনামিকার চিকিৎসক হওয়ার গল্প
*চিকিৎসক হওয়ার পথে চোখের জলই ছিল অনামিকার কালি
আশিক হোসেন, বদলগাছী(নওগাঁ)প্রতিনিধি:
কিছু স্বপ্ন কেবল চোখে দেখা যায় না, সেগুলো বুকের গভীরে জমে থাকে। জীবন যত আঘাতই দিক, সে স্বপ্ন ভাঙে না, বরং আরও দৃঢ় হয়। নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার সোহাসা গ্রামের অনামিকার জীবন ঠিক তেমনই এক অদম্য স্বপ্নের গল্প।
ছোটবেলা থেকেই তার একটাই পরিচয়-সে ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নের পথ মসৃণ না হয়ে! হয়ে ওঠে আরও কঠিন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় অনামিকা হারায় তার মাকে। মায়ের স্নেহ, নিরাপত্তা আর নির্ভরতার ছায়া এক মুহূর্তে সরে যায় তার জীবন থেকে। তখনই সে প্রথম বুঝতে শেখে জীবন কেবল পাঠ্যবইয়ের মতো সহজ নয়।
তবুও অনামিকা ভাঙেনি। চোখের জল লুকিয়ে রেখে সে ফিরে গেছে বইয়ের পাতায়। স্কুলের দীর্ঘ পথ, সীমাহীন কষ্ট আর নীরব সংগ্রামের মাঝেও স্বপ্নটা সে আঁকড়ে ধরেছিল শক্ত করে।
মাকে হারানোর শোক সামলে যখন সামনে এগোনোর চেষ্টা, ঠিক তখনই আবার আঘাত—মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় বাবার মৃত্যু। পৃথিবীর শেষ ভরসাটুকুও যেন হারিয়ে যায় তার। একদিকে ডাক্তার হওয়ার চাপ, অন্যদিকে বাবা-মাকে হারানোর গভীর শূন্যতা, দুই দিক থেকেই তাকে টেনে ধরেছিল অন্ধকার।
কিন্তু অনামিকা শিখেছিল ভিন্নভাবে বাঁচতে। সে শোককে দুর্বলতা বানায়নি; বরং শক্তিতে রূপ দিয়েছে। বাবা-মায়ের অপূর্ণ স্বপ্নকে নিজের জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে আবার দাঁড়িয়ে যায়।
এই যাত্রায় তার পাশে ছিলেন বড় বোন, বড় ভাই ও মামা। তাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর বিশ্বাসই হয়ে ওঠে অনামিকার সাহসের মূল উৎস। সেই সাহস নিয়েই সে অংশ নেয় ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় এবং সফল হয়।
এই সাফল্য কেবল একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়। এটি একজন এতিম মেয়ের জীবনে আলো জ্বালানোর মুহূর্ত। বদলগাছীর মানুষ আজ তাকে দেখে গর্ব করে, অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়।
পড়াশোনায় অনামিকা বরাবরই ছিল উজ্জ্বল। জেএসসি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি, লাবণ্য প্রভা বালিকা ও কমিউনিটি হাইস্কুল থেকে এসএসসিতে জিপিএ–৫, এরপর রাজশাহী সিটি কলেজ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ–৫, প্রতিটি ধাপে তার মেধা আর পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট।
প্রতিবেশীরা বলেন, মেয়েটা এতিম হলেও পড়াশোনা ছাড়া কিছু বোঝে না। আমরা চাই সে ডাক্তার হয়ে আমাদের এলাকার মুখ উজ্জ্বল করুক।
লাবণ্য প্রভা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন,
বাবা-মা হারিয়ে তার পথটা খুব কঠিন ছিল। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো সে ঝরে পড়বে। কিন্তু শোককে শক্তি বানিয়ে আজ সে মেডিকেলে জায়গা করে নিয়েছে, এটা আমাদের জন্য গর্বের।
নিজের সাফল্য নিয়ে অনামিকা খুব সাধারণ ভাষায় বলে,
বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল আমাকে ডাক্তার বানাবে। তাদের মৃত্যু আমার হাতে ছিল না, কিন্তু তাদের স্বপ্ন পূরণ আমার হাতে ছিল। আমি শুধু সেটাই করেছি। পরিবারের সহযোগিতা না পেলে আজ এখানে আসতে পারতাম না। সবাই দোয়া করবেন, আমি গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করতে চাই।
এই পথের শেষ এখনো আসেনি। সামনে আরও দীর্ঘ লড়াই, আরও অধ্যবসায় অপেক্ষা করছে। তবে অনামিকার চোখে আজ আর ভয় নেই—আছে আত্মবিশ্বাসের আলো। বাবা-মায়ের স্বপ্নই তার পথের দিশা।
বার্তা পেরক,
আশিক হোসেন
বদলগাছী, নওগাঁ।
তাং:-২০-১২-২০২৫ ইং
মোবাইল:- ০১৭৫০-৬২৬০৪৫

Reporter Name 










