
গোমস্তাপুরের মাঠে মাঠে সরিষা ফুলের হলুদ হাসিতে কৃষকের রঙিন স্বপ্নের হাতছানি
এমরান আলী বাবু, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে সরিষার হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে ফসলের মাঠ। চারদিকে হলুদ গালিচা বিছিয়ে যেন অপরূপ সাজে সেজেছে প্রকৃতি। সরিষা ফুলের মৌ মৌ গন্ধে বিমোহিত ফসলের প্রান্তর। এ নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে বাড়ছে প্রকৃতিপ্রেমীদের আনাগোনা। নীল আকাশের নিচে গোমস্তাপুরের বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে প্রকৃতির অলংকার হয়ে উঠেছে এ হলুদ সরিষার ফুল। সরিষা ফুলের সোনালী আভায় মোড়ানো মাঠগুলো যেন প্রকৃতির সাজানো হলুদ গালিচায় পরিণত হয়েছে। প্রকৃতি জুড়ে বইছে এখন শীতের হাওয়া। যেদিকে চোখ যায়, শুধুই হলুদ রঙের বিস্তৃতি। শীতের সোনা ঝরা রোদে মাঠ জুড়ে যেন ঝিকিমিকি করছে হলুদ ফুলের সমারোহ। এ যেন এক অপরূপ সৌন্দর্য।
শীতের রিক্ততায় রং ও প্রাণের স্পন্দন নিয়ে আসে সরিষা ফুল। দিগন্ত বিস্তৃত হলুদ সরিষা ফুলে সেজে উঠেছে প্রকৃতি। ফসলের মাঠের পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ যেদিকে তাকাই শুধু দু-চোখে হলুদ আর হলুদ ফুলের সমারোহ দেখা যায়। বিভিন্ন মাঠে মাঠে সরিষা ফুল প্রকৃতি প্রেমীদের মুগ্ধ করেছে। ষড়ঋতুর এই দেশে শীতকালের অগ্রহায়ণ মাস আসলেই ফসলের মাঠ যেন হলুদে হলুদে ছেয়ে যায়। চির সবুজের বুকে এ যেন কাঁচা হলুদের আল্পনা। প্রকৃতি সেজেছে অপরূপ সৌন্দর্যের নান্দনিক রুপে। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই যেন ফুলের মেলা। ফুলগুলো তাদের কলি ভেদ করে সুভাস ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। ফুলে ফুলে মৌমাছি মধু আহরন করছে।
সরেজমিনে মাঠে গিয়ে দেখা যায়, শীত মৌসুম আসতে না আসতেই প্রকৃতি প্রেমীরা সরষে ফুলের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে পড়েছে। শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষরা এই সরিষা ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে নেমে পড়েছে এ ফসলের মাঠে। সকালের সূর্যের কিরণ প্রতিফলিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই সরিষা ফুলের সমারোহে হেসে ওঠে চারদিক। হলুদ ফুলে ভরা সরিষার ক্ষেতে মৌমাছির গুঞ্জন আর কৃষকদের ব্যস্ত পদচারণায় মুখরিত থাকে ফসলের মাঠ। আমন ও বোরো ধান চাষের মধ্যবর্তী সময়ে তুলনামূলক স্বল্প সময়ে ও স্বল্প খরচে চাষযোগ্য এই তেল জাতীয় ফসলটি এখন কৃষকের বাড়তি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাঠ জুড়ে ফুলের সমারোহ ইতোমধ্যেই ভালো ফলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এ উপজেলায় এবার ৭ হাজার ৪ শত ৪৫ হেক্টর জমিতে সরিষা বাদ হয়েছে। যা গত বছর ছিল ৭ হাজার ৫ শত ৫০ হেক্টর। এবার ১ শত ৫ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ কম হয়েছে। চলতি বছর সরিষা আবাদকৃত জাতের মধ্যে সর্বাধিক চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে বারি সরিষা-১১ ও ১৪, বিনা-৯ ও ১১। চলতি বছর এ উপজেলায় ৬ হাজার কৃষকের মাঝে কৃষি প্রণোদনা স্বরূপ সার ও বীজ বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরেও কৃষি অফিসের উদ্যোগে সরিষা চাষের জন্য কৃষকদেরকে বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
উপজেলার রহনপুর ইউনিয়ন এর অধীন পাথরপূজা গ্রামের কৃষক উজ্জ্বল বলেন, একই জমিতে বারবার একই ফসলের চাষ করতে থাকলে জমির উর্বরতা অনেকাংশে কমে যায়। যার ফলশ্রুতিতে তারা আমন ও বোরো ধানের মাঝামাঝি সময়ে এই সরিষার চাষ শুরু করেছেন। এতে করে মাটির উর্বরতার পাশাপাশি কম শ্রম ও সল্প খরচে বাড়তি ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে। তিনি আরো জানান, আমি এবার ৩ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছি। বিঘা প্রতি আমার সরিষা চাষে খরচ হয়েছে ৩ হাজার টাকা।। দেশীয় সরিষার জাতগুলোর চেয়ে হাইব্রিড জাতের সরিষার ফলন ভালো হয়। সরিষা চাষ করে একদিকে যেমন তেলের চাহিদা পূরণ হচ্ছে অন্যদিকে বেশ লাভবান হচ্ছি। আশা করছি ৩ বিঘা জমিতে ২১ মন সরিষা পাব। গত বছরের চেয়ে এবার ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।
বোয়ালিয়া ইউনিয়নের বৈরতলা গ্রামের কৃষক করিম জানান, আমি এবার ২৫ কাঠা জমিতে সরিষার আবাদ করেছি। আশা করছি সরিষার এবার ফলন ভালো হবে। আমার ২৫ কাঠা জমিতে সরিষা আবাদ করতে খরচ হয়েছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। আশা করছি এই জমিতে আমি ৫ থেকে ৬ মন সরিষা পাব। সরিষা আবাদ করে ভোজ্য তেলের চাহিদাও মিটছে। সময় মত সরিষা তুলে বিক্রি করতে পারলে বাড়তি কিছু টাকা ঘরে আসবে বলে আশা করছি। এতে করে আমি পুরোদমে ইরি-বোরোর চাষ করতে পারব।
গোমস্তাপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা সাকলাইন হোসেন জানান, সরিষা কৃষকের একটি স্বল্প খরচের লাভজনক মধ্যবর্তী ফসল। চলতি বছর ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে গোমস্তাপুর উপজেলায় মোট ৭ হাজার ৭ শত ৪৫ সেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। বর্তমানে সরিষা ক্ষেতে ফুল অবস্থায় আছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ফুল ঝরে পড়ে গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত বছরের তুলনায় এ বছর বারি সরিষা ১৪ ও ১৭, বিনা সরিষা ৯ ও ১১ জাতের আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরিষা খেতে রাধানগর, পার্বতীপুর ও বাঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নে ৪৫০টি মৌবক্স স্থাপন হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন মধু উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে সরিষার ফলন বৃদ্ধিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চাষীদেরকে জমিতে সুসম সার ব্যবহারসহ অন্যান্য আন্ত:পরিচর্যা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সরিষার তেলের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য সালফার জাতীয় সার ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও কৃষকদের উন্নত জাতের সরিষার বীজ সংরক্ষণের পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।

Reporter Name 










