
আদমদীঘিতে ইউপির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতি; দুদকে অভিযোগ
আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধি:
বগুড়ার আদমদীঘির ছাতিয়ানগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হক আবুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়োগ বাণিজ্য, গ্রাম্য সালিশে বৈঠকে গোপনে অর্থ আদায়, টিআর, কাবিখা, কাবিটা, ওয়ানপার্সেন্ট ও এলজিএসপিসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন এলাকাবাসী৷ এই ঘটনায় গত ১৭ ডিসেম্বর ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়নবাসী দুর্নীতি দমন কমিশনের নিকট বগুড়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে নৌকার প্রতীকে ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আব্দুল হক আবু। নির্বাচিত পর দুই দফায় চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি দায়িত্বও ছিলেন। আওয়ামী লীগের শাসন আমলে রাতের আধারে ভোট কেন্দ্র দখল করে ভোটে নির্বাচিত হওয়ার অভিযোগও আসে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম খান রাজুর ছত্রছায়ায় আব্দুল হক আবু ছাতিয়ানগ্রাম ইউপির চেয়ারম্যানের দায়িত্বের পর থেকে নানা অনিয়মের মধ্যে জড়িয়ে পড়েন।
টিআর, কাবিখা, কাবিটা, ওয়ানপার্সেন্ট, এলজিএসপি, সহ বিভিন্ন সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে নাম মাত্র দেখিয়ে দপ্তরকে ম্যানেজ করে সরকারের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।
ছাতিয়ানগ্রাম কয়েকটি স্কুল মাদ্রাসার সভাপতির দায়িত্বে থেকে নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন তিনি। ছাতিয়ানগ্রাম অন্তাহার দাখিল মাদ্রাসার ৩টি নিয়োগ বাণিজ্য নিয়েছেন ৩৫ লাখ টাকা। একই গ্রামে অন্তাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈশ্য প্রহরী নিয়োগে নিয়েছেন ৯ লাখ টাকা। ছাতিয়ানগ্রাম দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪ টি নিয়োগে নেন ৪৮ লাখ টাকা। ছাতিয়ানগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ নিয়োগে নিয়েছেন ১৮ লাখ টাকা। ছাতিয়ানগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২ টি নিয়োগে নিয়েছেন ২২ লাখ টাকা। শুধু নিয়োগে সীমাবদ্ধ নয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে প্রধান শিক্ষকসহ সহকারী শিক্ষকদের জিম্মি করে ইচ্ছেমতো ঠিকাদার দিয়ে কাজ করিয়ে নেন তিনি। নিয়মনীতি ছাড়াই এভাবে বিভিন্ন দপ্তরকে ম্যানেজ করে নিয়মবহির্ভূতভাবে কোটি, কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন আব্দুল হক আবু। তার ইউনিয়ন এলাকায় খাস পুকুর বন্দোবস্তে প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করে সামান্য অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে পরে সেগুলো বিভিন্ন ব্যক্তিদের নিকট সাব লিজ দিয়েছেন। এদিকে ছোট আখিড়া মাদ্রাসা এলাকায় আব্দুল হক আবু ও তৎকালীন সনাতন ধর্মাবলম্বী উপজেলা নির্বাহী অফিসার টুকটুক তালুকদার যোগসাজশে নিম্ন মানের ইট, বালুসহ বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহার করে আশ্রয়ন প্রকল্পের প্রায় ১৪টি ঘর নির্মাণ করেন।
শুধু তাই নয় প্রশাসনের দিক থেকে ব্যাপক সহযোগিতা করতেন তৎকালীন সময়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার টুকটুক তালুকদার। ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হক আবু, উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম খান রাজু এবং তার স্ত্রী উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সদস্য মঞ্জুআরা বেগমের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিলো টুকটুক তালুকদারের। ছাতিয়ানগ্রাম ইউপির বিভিন্ন ফসলি মাঠে অবৈধভাবে গোপনে অনুমতি দিয়েছেন টুকটুক তালুকদার। বিভিন্ন প্রকল্পের গোপনে টাকা নিয়ে সরজমিনে পরিদর্শন ছাড়াই স্বাক্ষর করে দিতেন তিনি। সরকারি পুকুর বন্দোবস্তের বিষয়ে আওয়ামী লীগের পদধারী নেতাদের ব্যাপক সুবিধা প্রদান করারও অভিযোগ এসেছে ইউএনও টুকটুক তালুকদারের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে আব্দুল হক আবু ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান তৎকালীন ইউএনও টুকটুক তালুকদারের কাছে থেকে সরকারিভাবে নানা সুবিধা গ্রহণ করেছেন। অনেকেই বলছেন প্রায় মঞ্জুআরা বেগমের বাড়িতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার টুকটুক তালুকদারকে যাতায়াত করতে দেখা যেতো। এ কারনে এসকল নেতাকর্মীদের নিয়মবহির্ভূত কোন কাজেই বাঁধা প্রদান করতেন না তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ছাতিয়ানগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসানের নারী কেলেঙ্কারিসহ একাধিক ব্যক্তির নারী কেলেঙ্কারি ও বিভিন্ন গ্রাম্য সালিশে গোপন বৈঠক করে লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন। ২০২৩ সালের শেষের দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পূর্ব ঢাকা রোড নামক স্থানে তার দলীয় অফিসের সামনে জর্দার কৌটায় লাল কস্টেপ দ্বারা মুড়িয়ে পেট্রোল ঢালিয়ে আগুন জ্বালিয়ে বিএনপির প্রায় ২ শতাধিক নেতাকর্মীদের নামে নাশকতা মামলা দিয়েছেন। ২০২৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম খান রাজুর ছেলে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক সাইফুল্লাহ আল মেহেদী বাঁধনের ভোটের সময়েও বিভিন্ন অসহায় লোকদের মামলার দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভোটব্যাংকের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তিনি। ইউপি চেয়ারম্যান থাকাকালী তিনি ছাতিয়ানগ্রাম গড়ে তোলেন কিশোর গ্যাং৷ ফলে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে লাখ লাখ অবৈধ উপায়ে আয় করেছেন। গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের শর্তে নাম পরিবর্তন না হলেও আওয়ামী লীগের ক্ষমতার দাপটে জোর পরিবর্তন করেছেন একাধিক মালিকানা৷ যারফলে তার দাপটে সাধারণ লোকজন কোনঠাঁসা হয়ে দিনযাপন করেছেন। তার এই অবৈধ বিভিন্ন উপায়ে একাধিক এলাকায় বাড়িসহ কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স করেন৷ এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে জেলা দুদকের নিকট জরুরিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবী জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হক আবু অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, সামাজিক ভাবে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য অভিযোগটি করা হয়েছে। চেয়ারম্যান থাকার সময় অনেক ঘটনা আসে। কিছু নিয়োগে আমি ছিলাম আর কিছু নিয়োগ আমি সভাপতি ছিলাম না।
এ বিষয়ে তৎকালীন আদমদীঘি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও বর্তমান রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক টুকটুক তালুকদারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, আমি সকল কাজ পরিদর্শন করেই বিল দিয়েছি। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের বিষয়ে তিনি সঠিক কোন মন্তব্য করেননি। সকল কাজ নিয়ম মেনেই সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের বগুড়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মাহফুজ ইকবাল অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

Reporter Name 










