
মো. নাছির উদ্দিন, চাঁদপুর প্রতিনিধি।
গেলো বছরের উত্তাল জুলাই আন্দোলনে চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে বড় ধরনের সংঘর্ষ না ঘটলেও, সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি গেজেটে এ উপজেলার ২৮ জনকে আহত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় জুলাই আন্দোলনের আহতদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে আর্থিক সহায়তা নির্ধারণ করে। সেই তালিকায় শাহরাস্তির ২৮ জনের নাম উঠে আসে।
কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধান ও আন্দোলনকারীদের বক্তব্যে দেখা গেছে-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত অনেকের নাম ও তথ্য বিতর্কিত। অভিযোগ উঠেছে, কেউ বন্ধ হাসপাতালের চিকিৎসা দেখিয়ে নাম তুলেছেন, কেউ পূর্বের মানসিক সমস্যাকে আন্দোলনে আহত দেখিয়েছেন, আবার কেউ নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী হয়েও ‘আহত জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
এদের মধ্যে মো. রায়হান নামে একজন (গেজেট নং ৯৩৯) দাবি করেছেন, তিনি ৪ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে আহত হন এবং পরদিন শাহরাস্তির চিতোষী আইডিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তবে স্থানীয়দের মতে, হাসপাতালটি সরকার পতনের দুই বছর আগেই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তার চিকিৎসার তথ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
তালিকায় অন্তর্ভূক্ত ইউছুপ আলী (গেজেট নং- ৯২২) দাবি করেছেন, ৫ আগস্ট শাহরাস্তির কালিয়াপাড়ায় তিনি বাঁশের আঘাতে গুরুতর আহত হন এবং জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে এক লাখ টাকার চেকও পান তিনি। অথচ, সূত্র বলছে ওইদিন কালিয়াপাড়ায় কোনো সংঘর্ষই ঘটেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গেজেটে অন্তর্ভূক্ত কয়েকজন আসলে ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় সাবেক পৌর মেয়রের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তারা নিজেদের জুলাই আন্দোলনে আহত দাবি করে সরকারি সহায়তা নেন।
মো. কামরুল হাসান রাব্বি (গেজেট নং-৯২০) সিলেট সদর উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিনি ছাত্রলীগের কর্মী এবং আন্দোলনের সময় আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অথচ শাহরাস্তির আহত তালিকায় তার নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
নাহিদুল ইসলাম রাতুল (গেজেট নং- ১০৪৪) জুলাই আন্দোলনে মাথায় আঘাত পেয়ে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি ছোটবেলা থেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তারপরও তিনি সরকারি সহায়তা পেয়েছেন।
গেজেট নং- ২০১৩ শাহজালাল দাবি করেছেন, ২ আগস্ট কাঁচভাঙার আঘাতে আহত হয়ে ৩ আগস্ট শাহরাস্তি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। কিন্তু হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ওইদিন এ ধরনের কোনো রোগী সেখানে চিকিৎসা নেননি।
এসডিএফ (সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন) থেকে জুলাইয়ের ঘটনায় শাহরাস্তিতে ১১ জনকে সহায়তা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে নাজমুল হাসানের পরিবারকে ‘জুলাই আন্দোলনে নিহত’ দেখিয়ে দুই লাখ টাকার চেক দেয়া হয়। অথচ স্থানীয়দের মতে, নাজমুল গত ২৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানা অগ্নিকাণ্ডে মারা যান। মৃতদেহ উদ্ধার সম্ভব হয়নি। ফলে তার মৃত্যুর দাবিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও জানাগেছে, সহায়তা পাওয়া সকল ব্যক্তিই ওই এনজিও-র সদস্য এবং সুবিধাভোগী। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এসডিএফ শাহরাস্তি শাখায় যোগাযোগ করা হলে তারা জানান এটি একটি প্রকল্প। খিলাবাজার শাখায় গেলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
খিলাবাজার শাখায় গিয়ে সেখানে তাদের কার্যালয় তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। সেখানে ৩ ঘন্টা অপেক্ষা করেও কোন কর্মকর্তার দেখা মিলেনি।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থী আব্দুল কাইয়ুম মাহিন বলেন, আন্দোলনের সময় আমরা রাজপথে ছিলাম। অথচ গেজেটে যাদের নাম এসেছে তাদের অধিকাংশকেই আমরা চিনি না। অনেকে ভুয়া তথ্য দিয়ে সরকারি সহায়তা নিয়েছে। আমরা চাই ভুয়া নামগুলো বাতিল করে প্রকৃত আহতদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
#সরকার_পতন #আন্দোলন #গেজেট #ভুয়া #ছাত্রলীগ #বৈবিছাআ #বাতিল

নাসির উদ্দিন (চাঁদপুর) 
















