
মো.রোকন মিয়া (কুড়িগ্রাম জেলা) প্রতিনিধি:
তিস্তার উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়ছে মানুষ—জীবন বাঁচাতে, ঠিকানা টিকিয়ে রাখতে। প্রতিদিন সকালে নতুন ভাঙনের খবর, আর সন্ধ্যায় কোনো না কোনো পরিবার হারায় তাদের বসতভিটা। নদীর তীরের মানুষদের কাছে ভাঙন এখন অভিশাপের নাম, তবুও তাদের আশা মরে যায়নি।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের কিশোরপুর, হোকডাঙ্গা ও জুয়ান সাঁতরা এলাকায় তিস্তার তীব্র স্রোতে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। নদীর তীর গিলে নিচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, এমনকি মানুষের স্বপ্নও।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (৬ অক্টোবর) দুপুর ১২টার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি ১১৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে।
আব্দুল কাউম ফকিরের কণ্ঠে কষ্টের ছোঁয়া—“আমি যদি সময়মতো ঘর না সরাতাম, আজ সেটাও নদীতে ভেসে যেত।” গফ্ফার আলি বলেন, “আমার ৫২ শতক জমি নদীতে গেছে। আর কয়েক দিন পর ধান কাটার কথা ছিল—সব শেষ। আমার স্বপ্ন তিস্তার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।” মোছা. ছালেহা বেগম জানালেন, “২০ বারেরও বেশি ঘরভাঙার কষ্ট সয়েছি। এখন অন্যের জায়গায় থাকছি, কিন্তু এখানেও টিকতে পারবো না মনে হয়। আজ রাতেই হয়তো এই ভিটাটাও নদীতে যাবে।” জহরুল, ফুলবাবু, আবদুল ও জলিল মিয়া একসঙ্গে বললেন, “যেভাবে পানি বাড়ছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব ভেসে যাবে। আমরা চাই, দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে রক্ষা করা হোক।”
ভাঙনের কারণে কয়েকটি পরিবার পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অনেকে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউবা ভাসমান জীবনে বাধ্য হয়েছেন। কৃষিজমি হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শতাধিক মানুষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও মসজিদ-মন্দিরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও এখন ঝুঁকিতে।
উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নয়ন কুমার সাহা বলেন, “ভাঙন পরিস্থিতি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম বলেন, “এখানে আমাদের কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। ভাঙনরোধে পরিদর্শন করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নদীভাঙনের দুঃসহ বাস্তবতা সত্ত্বেও মানুষ এখনো আশাবাদী। কেউ নতুন বাঁধ নির্মাণের দাবি তুলছেন, কেউ সরকারি সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন। তাদের বিশ্বাস—একদিন হয়তো তিস্তার এই অপ্রতিরোধ্য ভাঙন থেমে যাবে, ফিরবে নদীর তীরে স্থিতি, শান্তি আর নতুন করে বাঁচার আশা।

মো.রোকন মিয়া (কুড়িগ্রাম জেলা) প্রতিনিধি: 















