
মোঃ তানজিলুল ইসলাম লাইক, রাজশাহী।
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) প্রায় ৪০০ কোটি টাকার “অপ্রয়োজনীয়” সাতটি কাজ বাতিল হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ বরাদ্দের অর্থ এখন ব্যয় হবে প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া নগর এলাকার উন্নয়নে। সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান প্রশাসন ইতোমধ্যে এসব কাজ বাতিলের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের মেয়াদকালে নেওয়া এই কাজগুলোর বেশিরভাগই ছিল জনস্বার্থবিরোধী ও নগরবাসীর কাছে অগ্রাধিকারের বাইরে। আওয়ামী সরকার পতনের পর থেকেই এই প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নানামহল থেকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। প্রশাসনিক পর্যায়ে পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়—যে কাজগুলো নাগরিক জীবনে সরাসরি সুফল দেবে না বা নগর উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেগুলো বাতিল করা হবে।
২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর লিটন ২০১৯ সালে একনেক সভায় “রাজশাহী মহানগরীর সমন্বিত নগর উন্নয়ন” নামে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রকল্প অনুমোদন করান। এটি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রকল্প। ওই প্রকল্পের আওতায় প্রশস্ত সড়ক, সবুজায়ন, আধুনিক আলোকায়ন ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলতে থাকে। রাজশাহীর চেহারা বদলে যায়, সারা দেশে প্রশংসা হয়। তবে প্রকল্পের কিছু অংশ নিয়ে নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের তীব্র আপত্তি ছিল—কারণ, এসব কাজ শহরের কেন্দ্র ও প্রদর্শনীমূলক স্থানে সীমাবদ্ধ ছিল, অথচ প্রান্তিক এলাকার অবস্থা ছিল অবহেলিত।
নগরবাসীর দাবির মুখে এবং প্রশাসনিক মূল্যায়নের পর প্রকল্পের অধীনে থাকা সাতটি কাজ বাতিলের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল শাখার সূত্রে জানা গেছে, ওই সাত কাজের মোট ব্যয় প্রায় ৩৯৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্প ছিল নগরের কোর্ট স্টেশন রেলক্রসিংয়ের ওপর উড়ালসেতু নির্মাণ। এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১১৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই স্থানে উড়ালসেতুর প্রয়োজন ছিল না—বরং রেল যোগাযোগের কারণে যানজট সাময়িক ও সীমিত। ফলে অপ্রয়োজনীয় এই প্রকল্প বাতিলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে নগরের ভদ্রা এলাকায় প্রথমে উড়ালসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে রেল কর্তৃপক্ষের আপত্তির মুখে সেটিকে আন্ডারপাসে রূপান্তর করা হয়, ব্যয় ধরা হয় ১১৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। কিন্তু দরপত্র আহ্বানের আগেই প্রকল্পটি অকার্যকর হিসেবে বাতিলের পথে যাচ্ছে।
এর বাইরে নগরের হড়গ্রাম এলাকায় ৮৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক কাঁচাবাজার নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও এই কাজটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। এখন সেটিও বাতিলের তালিকায়।
অন্যদিকে, সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন নগরের কাদিরগঞ্জে তাঁর বাবা, জাতীয় নেতা শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের স্মৃতি সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ২৮ কোটি টাকায় একটি স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। বর্তমান প্রশাসন মনে করছে, এটি ব্যক্তিনির্ভর ও অগ্রাধিকারবহির্ভূত। তাই এই প্রকল্পও বাদ পড়ছে।
এছাড়া সিটিহাট সড়কের পাশে ১৮ কোটি ৮০ লাখ টাকায় শেখ জামাল কনভেনশন হল এবং ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় সিটি কর্পোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড অফিস ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। নগরবাসীর মতে, এ দুটি কাজ শহরের প্রশাসনিক ব্যয় বাড়াবে, কিন্তু জনসেবা বাড়াবে না—তাই এগুলোর কাজও বাতিল হচ্ছে।
অন্যদিকে, ২৮ কোটি টাকায় আরও চারটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। ইতোমধ্যে নির্মিত ফুটওভার ব্রিজগুলো অকার্যকর ও কম ব্যবহৃত হওয়ায় নতুন ব্রিজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকেও সরে এসেছে রাসিক।
সব মিলিয়ে এই সাতটি কাজ বাতিল হলে ৩৯৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হবে, যা ব্যয় করা হবে নগরের প্রান্তিক উন্নয়নে—বিশেষ করে রাস্তা মেরামত, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সড়কবাতি স্থাপনে।
এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর বলেন, জনমুখী নয় এমন কাজগুলো প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা ব্যয় হবে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে। কোথাও রাস্তা মেরামত করতে হবে, কোথাও ড্রেন পরিষ্কার, কোথাও আবর্জনা সরাতে হবে—এই বাস্তব কাজগুলোই এখন অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, রাজশাহী এখন শুধু সৌন্দর্যের শহর নয়, এটি হবে নাগরিক সেবার শহর। প্রান্তিক মানুষের উন্নয়ন ছাড়া নগর উন্নয়ন পূর্ণ হতে পারে না।

Reporter Name 















